মিয়ানমারের সাথে সংঘাত-পরবর্তী সম্পর্ক উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে ——ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন (অবঃ)

Uncategorized আন্তর্জাতিক বিশেষ প্রতিবেদন রাজনীতি

ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফ ডব্লিউ সি, পি এস সি, এম ফিল (অবঃ), মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।


বিজ্ঞাপন

 

বিশেষ প্রতিবেদন :  প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের চলমান সংকটের প্রভাব অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এমনিতেই গত প্রায় সাত বছর ধরে বাংলাদেশ মিয়ানমার সৃষ্ট রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবেলা করে চলেছে এবং এখন পর্যন্ত এই সংকট সমাধানে আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী চিন ও রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘাতের পাশাপাশি আমাদের পার্বত্য জনপদে এখন অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে যা এই অঞ্চলের শান্তি ও অগ্রগতির উপর চাপ ফেলছে। আরাকান আর্মি (এএ) রাখাইনজুড়ে তাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং ফলে রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনী এই অঞ্চলে পরাজয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। গত বছরের ১৩ নভেম্বর আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে এ এ রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ছয়টি এবং বেশ কয়েকটি ছোট শহর দখল করেছে। মিয়ানমারের ১৭ শতাংশ ভূখণ্ডের ওপর জান্তা সরকারের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে, ২৩ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং ৫২ শতাংশের বেশি ভূখণ্ড বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের দখলে রয়েছে। সামরিক বাহিনী দখল হয়ে যাওয়া ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। রাখাইনে এ এ’র দখলে থাকা শহরগুলোতে বোমা ও গোলাবর্ষণ করছে জান্তা সরকার।

এই হামলার একটি বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে, এ এ যাতে এ অঞ্চলে কোনো প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করাতে না পারে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলের কাছে এ এ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ ও গুলি বিনিময়ের কারনে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সদস্যরা নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় টহল বাড়িয়েছে । সীমান্তে বিজিবির টহল জোরদার করার পাশাপাশি সীমান্তে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবি সতর্কতার সাথে দায়িত্ব পালন করছে। নিরাপত্তা পরিষদে আয়োজিত এক উন্মুক্ত বৈঠকে জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা এবং ভবিষ্যতে প্রত্যাবর্তনকারীদের রাখাইনে সফলভাবে পুনর্বাসনে সহায়তা করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে আঞ্চলিক সংস্থাসমূহ এবং আঞ্চলিক ও প্রতিবেশী দেশগুলোকে অর্থপূর্ণ এবং কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার অনুরোধ জানায়।

রাখাইন রাজ্যে জান্তা ও এ র’র মধ্যে সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে ১লা এপ্রিল মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডো সফরে এসেছিলেন চীনের এশিয়া সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষ দূত ডেং সিজুন। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে সামরিক সরকার রাখাইন রাজ্যে এ এ’র সাথে আপোষ না করলে ও ছাড় না দিলে শান্তি আসবে না। চীন রাখাইন ও উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্যে তাদের বিনিয়োগ রক্ষা করতে গিয়ে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চালাচ্ছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের ডেপুটি স্থায়ী প্রতিনিধি গেং শুয়াং বলেছেন, রাখাইনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চায় চীন। চীন মিয়ানমারে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে কাজ করছে। রাখাইন রাজ্যের চকপিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ সেখানে চীনা উন্নয়ন প্রকল্প এবং রাখাইন থেকে চীনের ইউনান প্রদেশে যাওয়া গ্যাস ও তেলের পাইপলাইন নিয়ে চীন উদ্বেগে রয়েছে। চীন সংঘাত অবসানের চেষ্টা করছে তবে এ ক্ষেত্রে আরাকান আর্মির উপর চীনের যথেষ্ট প্রভাব নেই বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করে। চীন ও মিয়ানারের মধ্যে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি সীমান্ত বাণিজ্য রয়েছে। চীন থেকে মিয়ামারের শান রাজ্য, মান্দালে ও ম্যাগউই অঞ্চল হয়ে রাখাইন রাজ্য পর্যন্ত বেইজিংয়ের তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন রয়েছে। তেল-গ্যাস সরবরাহে কোনো বিপর্যয় হলে তা চীনের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব ফেলবে।

কারেন সশস্ত্র যোদ্ধারা মিয়ানমারের সাথে থাইল্যান্ডের স্থল বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর মায়াবতী দখল করেছে। মিয়ানমারের অন্যান্য অংশে সংঘর্ষের কারণে সেনাবাহিনী কারেন রাজ্যে তাদের অবস্থান জোরদার করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সীমান্তে যাওয়ার প্রধান সড়কগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। জান্তা এখন বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলিতে বিমান হামলা চালিয়ে এই ক্ষতির কাটাতে চেষ্টা চালাচ্ছে। আসিয়ান থাইল্যান্ডের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে ত্রাণ সরবরাহের জন্য একটি মানবিক করিডোরের জন্য থাইল্যান্ডের প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে এবং ২৫ শে মার্চ থাই সীমান্তবর্তী শহর মায়ে সট থেকে মিয়ানমারে খাদ্য ও পানির সহায়তা নিয়ে ১০টি ট্রাকের প্রথম বহর সেখানে গিয়েছে। আসিয়ানের ত্রাণ সংস্থা ত্রাণ সরবরাহের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে যাতে ত্রাণটি ন্যায্যভাবে বিতরণ করা হয়। থাইল্যান্ড জানিয়েছে যে, জান্তা ও ই এ ও’র মধ্যে শান্তি আলোচনাকে উৎসাহিত করাই এই ত্রাণ করিডোরের উদ্দেশ্য। আসিয়ান দেশগুলো এবং জাপান, মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা প্রচারের পাশাপাশি আরও অনুকূল সরকারের সাথে সামরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে।

ভারত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিতওয়ে বন্দরের উন্নয়নে অর্থায়ন করেছে। চলমান সংঘর্ষের কারনে সেখানে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটে ১২০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠা এই বন্দরের কাছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও এ এ’র লড়াই চলছে এবং জান্তার বিরুদ্ধে এ এ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এ এ’র হাতে পালেতওয়া ও পশ্চিম মিয়ানমারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরের পতন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভারতীয় অনুদান সহায়তায় নির্মিত কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের অংশ হিসাবে সিতওয়ে বন্দর উন্নত করা হয়েছে। এ এ পরিকল্পিতভাবে সিতওয়ের পাশের ছোট ছোট শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং বন্দর নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে অঞ্চলটির অস্থিতিশীলতা অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর প্রভাব ভারত ও মিয়ানমারের বাইরেও বিস্তৃত এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ছে। শিলিগুড়ি করিডরের বিকল্প হিসেবে ভারতের কালাদান প্রকল্প এখন এ এ’র নিয়ন্ত্রণে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, রাখাইন অঞ্চল ভবিষ্যতে এ এ ও ‘ইউনাইটেড লিগ ফর আরাকানের (ইউ এল এ) প্রভাব বলয়ে থাকলে ভারত-চীনের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নতুন রূপ পাবে।

এন ইউ জি’র সাথে ইউ এল এ ও এ এ’র গঠনমূলক সম্পর্ক রয়েছে। এ এ’র প্রভাব ফেডারেল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সকল মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে ভবিষ্যতের যে কোনও আলোচনাকেও প্রভাবিত করবে। তাদের এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য এন ইউ জি, ইউ এল এ ও এ এ’র সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত রয়েছে। তাই এই দুটি দেশকে এ এ’র সঙ্গে তাদের সম্পর্ক জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

জাতিগত বিভেদের কারনে দশকের পর দশক ধরে আরাকান অস্থিতিশীল থাকায় সেখানকার উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে এবং তা থেকে উত্তরণে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যায়নি এবং রাখাইনের জনগণের ভাগ্যও পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ রাখাইন রাজ্যের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী হতে পারে এবং সামনের দিনগুলোতে রাখাইন ও বাংলাদেশের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক উভয়ের জন্য মঙ্গলময় হবে। বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের সংঘাত-পরবর্তী সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ তৈরি এবং রাখাইনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে এখন থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি এ এ ও ইউ এল এর সাথে ও সম্পর্ক স্থাপন ও উন্নয়নের চেষ্টা চলমান রাখতে হবে। রাখাইনের আভ্যন্তরীণ সংকটের কারনে সৃষ্ট সীমান্ত অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির বিরূপ প্রভাব কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের পাশাপাশি মিয়ানমারের অন্যান্য প্রতিবেশী চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডের সাথে যোগাযোগ রেখে নিরাপত্তা ও অন্যান্য ইস্যুতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

মিয়ানমারের চলমান অভিযানে ই এ ও’রা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সফলতা লাভ করবে কিনা তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে চলমান এই সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি চীনসহ মিয়ানমারের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করছে। একটি স্থিতিশীল, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক মিয়ানমার প্রতিবেশী দেশ চীন ছাড়াও অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলোর ভূ-কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। এজন্য সকল পক্ষকে ই এ ও এবং এন ইউ জি’র সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *