পাটুরিয়া থেকে বারোবাড়িয়া ৩৬ কিলোমিটার পর্যন্ত শতাধিক সড়ক বাতি জ্বলছে না : সন্ধ্যা নামলে-ই এ যেন এক ভুতড়ে এলাকা !

Uncategorized অপরাধ আইন ও আদালত গ্রাম বাংলার খবর জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি :  মানিকগঞ্জ জেলার ঢাকা আরিচা মহাসড়কের বেশির ভাগ বাস স্টান্ড গুলো চার লেনের সার্ভিস লেনে উন্নতি করুণ হয়েছে।সেই সাথে রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট লাগানো হলেও বর্তমানে তা অনেক স্থানেই জ্বলছে না। সূর্যের আলো নিভে গেলেই মহাসড়কে ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করে। আলো না থাকায় জেলা-বাসীকে চলাচল করতে হয় সড়কের পাশের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আলো বা যানবাহনের আলোতে মহাসড়কের রাস্তা দেখতে  হয় পথচারীদের।
দেশের ২১ জেলার প্রবেশ দ্বারখ্যাত মানিকগঞ্জের ঢাকা আরিচা মহাসড়ক। মানিকগঞ্জ জেলার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাটুরিয়া থেকে বারোবাড়িয়া ৩৬ কিলোমিটার পর্যন্ত শতাধিক সড়ক বাতি জ্বলছে না। পথচারীররা যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারেন সে জন্যই এই সড়ক বাতি বা ল্যাম্পপোস্টগুলো বসানো হয়েছে। সন্ধ্যার পর ল্যাম্পপোস্টগুলোতে আলো জ্বলার কথা। কিন্তু যখন সন্ধ্যা হয়ে অন্ধকার নেমে আসে তখন আর ল্যাম্পপোস্টগুলো আলো জ্বলে না।
নির্দিষ্ট দূরত্বে পর পর ল্যাম্প পোস্টগুলো দাঁড়িয়ে থাকলেও সেগুলোর বাল্ব নিভে আছে। দিনের পর দিন রাতের অন্ধকারে সড়কে চলাচল করতে হচ্ছে জেলা বাসিকে । শুধু কোনো গাড়ি আসলেই চোখে দেখা যায় মহাসড়ক।এই সড়কে রাতে আলো না থাকায় অন্ধকারে ঘটছে জানা অজানা অনেক ঘটনা। এতে প্রায়ই জেলার অনেক এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। মহাসড়ক অন্ধকার থাকায় অপরাধিরা সহজেই পালাতে পারছে।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি দাড়িয়ে আছে ল্যাম্পপোস্ট।অধিকাংশ সড়কেই বাতি আছে আলো নেই আবার কিছু সড়কে অনেক দূর পরপর দু-একটি খুঁটিতে বাতি জ্বলে, তারপর আবার অন্ধকার। এর মধ্যেও কিছু সড়কবাতির ঢাকনা নেই, কোনোটির খুঁটি বাঁকা, আবার কোনো খুঁটিতে বাতি নেই। মূল শহর, বাণিজ্যিক এলাকা ও আবাসিক এলাকাতেও খুব একটা বাতি জ্বলতে দেখা যায়নি।
জানা গেছে , ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের  সড়কবাতি স্থাপনের কয়েক মাসের মধ্যেই দেখতে অনেকটা খেলনা বাতির মতো হয়ে গেছে। দেখভালের অভাবে কাক্সিক্ষত সুফল মিলছে না। কোটি কোটি টাকার সড়কবাতি পড়ে আছে খাম্বার ওপরে। বাতি আছে ঠিকই, কিন্তু নেই আলো। এতে বেড়েছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ।
মানিকগঞ্জ জেলার সিমান্ত দ্বার বারোবাড়িয়া থেকে গোলড়া বাস স্ট্যান্ড বিসিক এলাকা সহ অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। কারখানার শ্রমিক আর পথচারীদের চলাচলে রাতদিন সরগরম থাকে এ সব এলাকা। সেখানকার অধিকাংশ সড়কেই বাতি জ্বলে না। চলাচল করতে হয় মুঠোফোনের আলো জ্বালিয়ে।
ল্যাম্পপোস্ট বাতি স্থাপনের পর প্রায় ২৪ মাসের মধ্যে বারোবাড়িয়া থেকে মানিকগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডের ল্যাম্পপোস্টের প্রায় সব বাতি বন্ধ হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বণ্যা নামের এক নারী শ্রমিক জানান, আমরা কারখানায় কাজ করে প্রতিদিন এ সড়ক দিয়েই যাই। বেতন পাওয়ার দিন অনেক ভয়ে থাকি। অন্ধকার রাস্তায় কখন না ছিনতাইকারী এসে সব নিয়ে যায়। জানেন ভাই, অন্ধকারের মধ্যে সবচেয়ে কষ্ট হয় নারীদের। সকাল ভোরে আসতে হয় আবার কখনো রাতে আফিসে আসতে হয়, যেতে হয়। লাইটগুলো জ্বলা থাকলে সব দেখা যায়। তখন আর এই ভয়ে থাকতে হবে না।
সবুজ নামের এক দোকানী বলেন, এই সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসড়ক। হাজার হাজার শ্রমিকরা যাতায়াত করেন সড়কটি দিয়ে। ফলে চারপাশ নীরব থাকায় এ পথে যাতায়াতকারী শ্রমিক ও নানা পেশাজীবী মানুষ চলাচলকালে আতংকিত থাকতে হয়। অন্ধকারে ছিনতাইয়ের শঙ্কায় ভুগতে হয়। এছাড়া হাঁটার সময় একটু অসাবধান হলে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটছে। কিছু কিছু স্থান অন্ধকার থাকায় মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের আনাগোনাও বেড়েছে।
মহাসড়কে বাতির এমন ভোগান্তিতে ক্ষোভ দেখা গেছে সাধারণ জনগণের মাঝে। মোটরসাইকেল চালক মনির বলেন, মাঝে মাঝেই তো দেখি এ অবস্থা! বাসা যেহেতু এখানে অন্ধকারেই যাতায়েত করি । এ সড়ক দিয়েই যেতে হয়, চলাচল তো করতেই হবে। যে কোনো সময় আমাদের মত আরোহীদের মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সড়কের উল্টো পাশ থেকে যখন বড় কোনো গাড়ি আসে সেই গাড়ির আলোতে সামনে আর কিছুই চোখে দেখি না। তবে রাস্তায় বাতি থাকলে এমন হতো না।
শরীফ হোসেন নামের এক স্থানীয় জানান, অন্ধকারে কখনো কখনো সড়কে ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটে, পথচারীরা ভয় নিয়ে চলাচল করে । কলকারখানা থাকার কারনে বিভিন্ন জায়গায় মানুষ ও গাড়ির হেলপার ড্রাইভার সড়কের পাশে গাড়ী রাখে। মহাসড়কের পাশে গাড়ি রাখার কারনে মাদকসেবীরা  অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, আবার কখনো অসামাজিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে।
পাশা নামের একজন বলেন, কয়েকদিন আগে ঢাকা আরিচা মহাসড়কে রাতে বারোবাড়িয়া সংলগ্ন রাইজিং গ্রুপের পপুলার প্যাকেজ অ্যান্ড এক্সেসোরিজ লিমিটেডে দুর্ধর্ষ ডাকাতির হয়েছে । নগদ ২ লাখ ২০ হাজার টাকাসহ ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকার মালামাল ডাকাতি করে ২০/২৫ জনের সংঘবদ্ধ একটি ডাকাতির খবর শুনা গেছে।
স্থানীয় লোকজন আরো জানান, বাতির অধিকাংশই এখন অকেজো অবস্থায় রয়েছে। বাতিগুলো না জ্বলায় সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সরকারের কোটি কোটি টাকা জলে গেছে বলে মনে করছেন তাঁরা। সড়কবাতি না থাকায় এসব এলাকায় মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়েছে।এসব অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও দেখভালের কথা থাকলেও ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন না সড়ক ও জনপথের লোকজন।
নিম্নমানের যন্ত্রাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সড়ক বাতিগুলোর এই অবস্থা হয়েছে। বাস স্ট্যান্ড গুলোতে নির্দিষ্ট দূরত্বে পর পর ল্যাম্প পোস্টগুলো দাঁড়িয়ে থাকলেও সেগুলোর বাল্ব নিভে আছে।  এছাড়া, রাতে প্রধান প্রধান মহাসড়কে বাস স্ট্যান্ড গুলোতে ল্যাম্প পোস্টের বাতি যেমন থাকে না, তেমনই ওইসব সড়কে দেখা মেলে না সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশের টহল। এসব সড়কে অন্ধকারের সুযোগ নেয় ছিনতাইকারীরা। অনেকেই ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে টাকা, গহনা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়াচ্ছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, মানিকগঞ্জ জেলার প্রবেশ দ্বার বারোবাড়িয়া, গোলড়া, মানিকগঞ্জ বাস স্ট্যান্ড, বানিয়াজুরি, পুখুরিয়া, মহাদেবপুর, বরঙ্গাইল, ফলসাটিয়া, টেপরা, উথুলী বাজার এর প্রধান সড়কে ল্যাম্প পোস্ট থাকলেও চলছে আলো আধারের খেলা।
কিছু কিছু স্থানে সড়কবাতি থাকলেও কয়েকটি খুঁটির পরপর বাতি অকেজো। আশপাশে থাকা দোকানপাটের বাতি ও সাইনবোর্ডের আলো সড়কে পড়ে। তাঁরা সে আলোর ওপর ভরসা করে যাতায়াত করেন স্থানীয় মানুষ।এ সময় অনেক স্থানে দু-একজন কে মুঠোফোনের আলো জ্বেলে হাঁটতে দেখা যায় ।
উথুলী শহীদ রফিক মোড় থেকে শহীদ রফিক চত্বর পযন্ত কোথাও কোথাও ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলছে আবার কোথায় একদম অন্ধকার । এ সময় আরিচা বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব বাতি বন্ধ। যেসব বাতি জ্বলছে সেখানে একটু আলোকিত, আবার যেসব বাতি জ্বলছে না সেখানে ভূতুড়ে অন্ধকার।
এ সম্পর্কে মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, মো আব্দুল কাদের জিলানী বলেন, সড়কের বাতি নিয়ে একটু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। গোলড়া থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত এ সড়কের বাতিগুলোর টাইমার দেওয়া অর্থাৎ সয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে এবং নেভে কিন্ত বর্তমানে কিছু জ্বলছে আবার কোনো স্থানে জ্বলছে না।
ল্যাম্পপোস্টে গুলো নির্মানে নিম্নমানের পণ্য সামগ্রী বা নির্মাণ ত্রুটির জন্য এমন হচ্ছে কি?  এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে এসবের কিছুই হয়নি। বর্তমানে ল্যাম্পপোস্টের তার ও যন্ত্রাংশ চুরি করে নেওয়ার কারণে লাইটগুলো বন্ধ আছে।  রাতের আধারে চুরি করে নিয়েছে। ল্যাম্প পোস্টের তার ও যন্ত্রাংশ গুলো উন্নতমানের ছিলো ও দামি ছিলো। সে কারনে জেলার বিভিন্ন স্থানে রাতের আধারে তার গুলো চুরি হওয়ার কারনে সড়ক বাতি জ্বলছে না।
তার চুরি বিষয়ে থানায় মামলা করা হয়েছে নাকি? জানতে চাইলে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, মো আব্দুল কাদের জিলানী বলেন, মহাসড়কে সিসিটিভি থেকে ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে থানায় দেয়েছি এবং থানায় সাধারন ডায়েরি করেছি তার চুরির ব্যপারে।
এ সময় তিনি আরো বলেন, মহাসড়কে সড়কবাতি লাগানো হয়েছিলো যা দেখে রাতে মহাসড়কে দৃষ্টিনন্দন মনে হতো ।অত্যাধুনিক বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলবে ও নিভবে। এই আলোকায়নে রাস্তায় নাগরিকদের চলাচল স্বাচ্ছন্দ্যের হয়েছে অন্যদিকে নিরাপত্তা বাড়িয়েছিলো কিন্ত তার গুলো চুরি হওয়ার কারনে এখন সব অন্ধকার।
অচল বাতি, বাতি সচল করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশা করি কিন্ত বরাদ্দ না থাকায় অনেক কাজই করা যাচ্ছে না। ল্যাম্প পোস্ট গুলো মেরামতের বরাদ্দ পেলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা করবো।
মানিকগঞ্জ সদর থানা সূত্রে জানা যায়, মানিকগঞ্জ বাস স্ট্যান্ড এলাকায় পুলিশ লাইন হতে সদর উপজেলা গেট পযন্ত দুই সারিতে মানিকগঞ্জ সড়ক বিভাগের সড়ক বাতি রয়েছে। কিছু দিন যাবৎ সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে কিছু সংখ্যক বাতি না জ্বলার কারণে  গত, ১৫ জানুয়ারি রাত ৮ টার দিকে মানিকগ সড়ক বিভাগের কিছু কর্মকর্তা মানিকগঞ্জ সদর থানা এলাকায় এ সব সড়কবাতি পরিদর্শনে গেলে যায় ৩৭ টি পোল বাতি গুলো জ্বলছে না। এ সময় তারা লাইন গুলো চেক করে দেখতে পান সড়ক বাতির তার গুলো চুরি হয়েছে। উপরোক্ত বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্য মানিকগঞ্জ থানায় সাধারণ ডাইরীভুক্ত করে করেছে সড়ক বিভাগ মানিকগঞ্জ।
মানিকগঞ্জের গোলড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুপল চন্দ্র দাস জানান,ঢাকা আরিচা মহাসড়কের সড়কবাতি না থাকার কারনে তল্লাশি করতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সমস্যা হচ্ছে। এ কারনে বিভিন্ন চিহ্নিত অপরাধিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। আর এর মাশুল গুনতে হচ্ছে হাইওয়ে পুলিশকে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানানো হবে সড়কে বাতি সংযোজন করার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *