ডেঙ্গু মোকাবিলায় কোনো ব্যবস্থা নেই ডিএসসিতে

অন্যান্য এইমাত্র জাতীয় জীবন-যাপন ঢাকা রাজধানী সাস্থ্য

২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৫৫

বিশেষ প্রতিবেদক : ডেঙ্গু মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বেশ কিছু উদ্যোগ নিলেও তেমন তৎপরতা চোখে পড়েনি দক্ষিণ সিটিতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্ষার আগে করা জরিপে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ৪১নং ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়নি তেমন কোনো উদ্যোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই বেলা ওষুধ ছিটানো হলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে থাকলেও নেয়া হয়নি সচেতনতামূলক কোনো প্রচারণা। যদিও এ অভিযোগ মানতে নারাজ ওয়ার্ড কমিশনার। সিটি করপোরেশন থেকে নির্দেশনা পেলেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
জুন থেকে সেপ্টেম্বরকে ডেঙ্গু মৌসুম ধরা হলেও রাজধানীতে এ বছর এর প্রকোপ শুরু হয়েছে অনেক আগেই। প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত নানা বয়সী মানুষ। গেল ছয় মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৮ শ ৩৯ জন রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যাদের মধ্যে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের এ বছরের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের চেয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকাতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি।
রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ৫৫ : মঙ্গলবার (২৫ জুন) দুপুর বারোটা থেকে বুধবার (২৬ জুন) বারোটা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন হাসপালাতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৫৫ জন। তবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় ততটা তৎপর নয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, এমনটাই অভিযোগ বাসিন্দদের। তবে এসব নাকচ করে ডিএসসিসি বলছে শিগগিরই বড় পরিসরে মাঠ নামছে তারা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪১নং ওয়ার্ড। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্ষার আগে করা জরিপে দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। অথচ এই এলাকাতেই এখনো চারদিকে ছড়ানো আবর্জনার ভাগাড়, পরিত্যক্ত টায়ারসহ সহজেই পানি জমার অসংখ্য আধার। এক পশলা বৃষ্টিতেই পানি জমছে এসব জায়গায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দু’বেলা ওষুধ ছিটানোর বাইরে নেয়া হয়নি তেমন কোনো পদক্ষেপ। যদিও তা মানতে নারাজ স্থানীয় কাউন্সিলর।
সিটি করপোরেশনের আশ্বাস হঠাৎই মারাত্মক হতে যাওয়া এডিস নিয়ন্ত্রণে নেয়া হচ্ছে আরো নতুন পদক্ষেপ।
ডিএসিসি’র প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. শরীফ আহমেদ বলেন, সেন্ট্রাল র‌্যালি হবে, ওয়ার্ড ভিত্তিক র‌্যালি হবে, স্কুলের বাচ্চাদের কাছেও যাবো।
এদিকে মঙ্গলবার দুপুর বারোটা থেকে বুধবার বারোটা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন হাসপালাতে ৫৫ জন নতুন করে আক্রান্তের কথা নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এ নিয়ে এবারে মোট রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১শ’ ৬৭ জন। এর মধ্যে ৩২ জন ঢাকা মেডিকেলে, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ২১, মিডফোর্ডে ২২, পিলখানার বিজিবি হাসপাতালে ১৭ জন ভর্তি রয়েছেন।
যদিও এদের মধ্যে মারাত্মক রোগীর সংখ্যা অনেক কম। তবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় হাসপাতালগুলো প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ঢামেকে’র সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ যায়েদ হোসেন বলেন, এই মৌসুমে সাধারণত যে পরিমাণ রোগী আসে, তার চেয়ে বেশি রোগী পাচ্ছি এবার।
দুই দিনের বেশি জ্বর দেখা দিলেই চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ তাদের।
সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিত্র :
সাড়ে তিন বছরের শুদ্ধ সুহাস। গত ঈদুল ফিতরের চার-পাঁচদিন আগে থেকেই জ্বর ভুগছিল। কখনও কমে যায় ফের শরীরে তাপ বাড়ে। এমন থেমে থেমে চলা জ্বর শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গু হিসেব ধরা পড়ে গেল সপ্তাহে। সেদিন থেকেই শুদ্ধ রাজধানীর পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি। গেল রোববার তাকে চিকিৎসক ছাড়পত্র দিলেও শুদ্ধর পরিবার হাসপাতাল ছাড়তে পারেনি। কারণ এবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন শুদ্ধর মা। রক্ত পরীক্ষায় জানা গেছে তিনিও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।
শুদ্ধর মা ছাড়াও পান্থপথের বেসরকারি হাসপাতাল -হেলথ অ্যান্ড হোপে গত সাতদিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন পাঁচ জন। যার মধ্যে ৪ জন নারী ও একজন শিশু।
শুধু হেলথ অ্যান্ড হোপই না রাজধানীর গ্রিন রোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ১ শ ৫৫ জন। এছাড়া কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে ১শ ১১ জন ও ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী।
সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, হাসপাতালগুলোতে এখন প্রচুর ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে। শুধু গত ২৩ জুন -একদিনেই সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ২২ জন। এছাড়া সরকারি- বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর সংখ্যা ১০৩ জন।
এছাড়া গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত ঢাকার সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন মোট ৮ শ ৩৯ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৭শ ৩৪ জন। আর মারা গেছেন দুইজন।
জরিপ ও প্রতিরোধ :
জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু হানা দিয়েছে সময়ের অনেক আগেই। সাধারণত বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস ‘ডেঙ্গু মৌসুম’ বলে পরিচিত হলেও এবার মধ্য মে থেকেই ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে। এ কারণে হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছেন রোগীরা। প্রতিটি হাসপাতালেই এখন ডেঙ্গুর প্রচুর রোগী। এরই মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন দুজন।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, গত ৩ থেকে ১২ মার্চে ঢাকার ৯৩টি ওয়ার্ডের ১০০টি জায়গায় অধিদফতর ডেঙ্গু নিয়ে জরিপ চালিয়েছে। অন্যবারের চেয়ে এবারের জরিপ বেশি ‘মডিফায়েড এবং স্ট্যান্ডার্ড’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, এবারে সব বাসাকে নেওয়া হয়েছে এসব জায়গায়। অ্যাপার্টমেন্ট হাউজ, সেমি স্ট্রাকচারড হাউজ বা অর্ধপাকা এবং আরেকটি হচ্ছে নির্মণাধীন ভবন।
মার্চ যদিও শুষ্ক মৌসুম হিসেবে পরিচিত কিন্তু আমরা এবারে মার্চকে পুরোপুরি ড্রাই সিজন বলছি না। এবার ফেব্রুয়ারি থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়। গতবছরের সঙ্গে এই জরিপ তুলনা করা মুশকিল। গতবছর এই জরিপ হয় জানুয়ারিতে যখন আসলেই তা শুষ্ক মৌসুম ছিল। এবারের জরিপে ‘অ্যাডাল্ট মশা’ ও দেখা গেছে যেটা অন্যান্যবার শুধু লার্ভা ছিল। তবে লার্ভা থাকা মানেই এডিস মশার জন্ম হবে-সেটাও উল্লেখযোগ্য হারে ছিল। তাই এখনই সচেতন না হলে সমস্যা যে আরও বাড়বে তা পরিষ্কার।
তবে উত্তর সিটি করপোরেশনের চেয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি বলে মন্তব্য করেন ডা. সানিয়া তহমিনা। তিনি বলেন, এর কারণ হতে পারে উত্তর সিটি করপোরেশন কিছুটা হলেও পরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠা। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পুরোটাই প্রায় অপরিকল্পিত। এসব এলাকায় মানুষের বসতিও খুব ঘন।
তিনি বলেন, উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ডেঙ্গু নিয়ে আমাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি ডেঙ্গু প্রতিরোধে কিভাবে সামনে এগোবেন সে বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছেন। আমরা তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছি।
গত বছরের তুলনায় এই বছরে এই সময়ে রির্পোটেড কেস বেশি মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর পেছনে কয়েকটা কারণ থাকতে পারে। এবার প্রায় দেড় হাজারের মত চিকিৎসক এবং নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে আইসিইউ এর চিকিৎসকদেরও। এছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে যেন ডেঙ্গুর গাইডলাইন অনুযায়ী হাসপাতালে আসা রোগীর বিষয়ে আমাদের তারা রির্পোট করেন। এ বিষয়ে সম্প্রতি তাদের দ্বিতীয় দফায় চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া দুই সিটি করপোরেশনের ১০টি জোনের কর্মীদের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি মিটিং করা হয়েছে।
খুব আস্থার সঙ্গে বলতে পারি আমাদের দিক থেকে গাফিলতির কোনও সুযোগই নেই-বলেন ডা. সানিয়া তহমিনা। ডেঙ্গু রোধে আমরা সর্বাত্মক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বরাবরের মতো ডেঙ্গুর প্রকোপ আবার শুরু হয়েছে। অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার রোগটি সময়ের বেশ আগেই তা দেখা দিয়েছে। গত বছরই দেখা গেছে ডেঙ্গুর ধরণ বদলে যাচ্ছে। তবে এবার সেই বদলে যাওয়া লক্ষণে আরও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এবার হেমোরেজিক ডেঙ্গু একদমই কম।
ড. লেলিন চৌধুরী জানান, আগে যেমন তীব্র জ্বর এবং প্রচ- শরীর ব্যাথা থাকতো এবারের ডেঙ্গুতে জ্বর তীব্র না, শরীর ব্যাথাও উল্লেখযোগ্য না। এছাড়া র‌্যাশও কম পাওয়া যাচ্ছে-যা কীনা ডেঙ্গুর অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে এতদিন বিবেচিত হয়েছে। এবছর সব বয়সের রোগীদের পাওয়া যাচ্ছে ।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এবং মশা নিধনে সমন্বিত কার্যক্রম নেওয়া দরকার বলেও মন্তব্য করেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, দেখা গেল, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও হয়তো উত্তরে তা নেওয়া হয়নি। আবার মশার যে প্রজনন ক্ষেত্রগুলো রয়েছে সেগুলো সবাই মিলে একইসঙ্গে সমন্বিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে না।
ডা. লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, আমরা বারবার বলেছি, ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ এবং ঢাকার সন্নিহিত এলাকাগুলোতে একইসঙ্গে মশা মারা, মশার প্রজনন স্থানগুলো পরিষ্কার করা ছাড়াও মানুষকে সচেতন করতে হবে। এটি না করলে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়, ভিন্ন ভিন্ন উদ্যোগ না নিলে ডেঙ্গু কমবে না। কোনও উদ্যোগই ফলপ্রসু হবে না। একটি বৃহত্তর পরিকল্পনা করে একসঙ্গে সবাইকে উদ্যোগ নিতে হবে।


বিজ্ঞাপন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *