বাড়ছে দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার

অপরাধ আইন ও আদালত এইমাত্র জাতীয় সারাদেশ

অপরাধ-খুন

মহসীন আহমেদ স্বপন : সারাদেশে ছিনতাই-খুনসহ নানা অপরাধে ছুরি, কাচি, হাঁসুয়া, চাপাতি, কুড়াল, দা, বটির ব্যবহার বেড়েছে। এগুলোকে আমরা সাধারণত দেশীয় অস্র বলে থাকি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাতের নাগালের মধ্যেই এসব দেশীয় অস্ত্র মেলে। এসব অস্ত্র সস্তা ও বহনেও সুবিধাজনক। তাই আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়ে দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি সারাদেশের কয়েকটি আলোচিত ঘটনার পর নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। এটি এখনই থামাতে না পারলে দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার ভয়ংকর আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনের সড়কে দেশীয় ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে রিফাত শরীফ নামে এক যুবককে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যে ঘটনা পরে ভাইরাল হয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এরপর ৩০ জুন সন্ধ্যায় ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুঠিয়া এলাকায় দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মো. রনি মিয়া নামে এক অটোরিকশা চালককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একইদিন রাজশাহীর পুঠিয়া এলাকায় কারিমা খাতুন নামে এক নারীকে ঘরে ঢুকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়- ছুরি, কাচি, হাঁসুয়া, চাপাতি, কুড়াল, দা, বটি, বল্লম, তীর ইত্যাদি দেশীয় অস্ত্রের মধ্যে পড়ে। এর বাইরে লাঠি, ঠ্যাঙ্গাও দেশীয় অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়, যদি তা দিয়ে মানুষের জীবননাশের হুমকি থাকে।
ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে কেউ রেহাই পায় না। অস্ত্র মামলায় সাজার পরিমাণ বেশি, পুলিশও তৎপর থাকে বেশি। যে কারণে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার কমে গেছে। সারাবছর এসব অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের নানারকম অভিযান থাকে, ফলে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার নেই বললেই চলে।
পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, গত এক মাসে সারাদেশে কত সংখ্যক কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান পুলিশ সদর দফতরের হাতে পৌঁছায়নি। বিভিন্ন পত্রিকায় যেসব ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে তার সংখ্যাও কম নয়। সেগুলোর হিসেব আমরা প্রস্তুত করছি। এরই মধ্যে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী বিভিন্ন জেলায় ট্যুর করছেন। সেখানে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ে জেলার সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। সমাজ সচেতন ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন।
সারাদেশে গত ২৮ দিনে অন্তত ২৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের গোপনীয় শাখার অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সারা দেশে দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া সবার জন্য উদ্বেগজনক। এটি থামাতে করণীয় ঠিক করতে আইজিপির নির্দেশে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সামাজিকভাবে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
হঠাৎ করে কেন দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে গেছে জানতে চাইলে এআইজি মিডিয়া সোহেল রানা বলেন, যারা দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করছে তারা মূলত ছিঁচকে প্রকৃতির। এদের বেশিরভাগই জীবনে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি। আবার অনেক সময় পারিবারিক কোন্দলেও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করছে অনেকে। অন্যদিকে, আগ্নেয়াস্ত্র বহন করা সন্ত্রাসীদের আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ পুলিশ আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক বেশি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, পুলিশি অভিযানের কারণে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা থাকায় এর ব্যবহার কমেছে। তাছাড়া উঠতি সন্ত্রাসী বা এলাকার ছিঁচকে দুর্বৃত্ত টাইপের কেউ কেউ মারামারি বা নিজের আধিপত্য ধরে রাখতেই দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করছে। এখন এগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করতে পারলেও এটিও থাকবে না বলে মনে করছি।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার সেনসেশন তৈরি করে, যার ফলে অপরাধীরা এটি কম ব্যবহার করে। অপরদিকে খুব সহজেই দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে মূল জায়গা সমাজ নির্মাণে যারা ভূমিকা রাখছে তাদের। সমাজে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা কমে গেছে। পুলিশ তো অপরাধ দমনে কাজ করছেই, পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানীসহ সচেতন মহলকে আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করার আহ্বানও জানান তিনি।


বিজ্ঞাপন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *