বাস্তবায়নে বাধা, নতুন সড়ক পরিবহন আইন শুক্রবার থেকে কার্যকর

অর্থনীতি এইমাত্র জাতীয় জীবন-যাপন

ফাঁসি দিলে দুর্ঘটনা বন্ধ হবে এটা অলীক কল্পনা

মহসীন আহমেদ স্বপন : মোবাইলে কথা বলতে বলতে রাস্তা পারাপার, পারাপারের সময় রাস্তায় চোখ না রেখে নজর দেন মোবাইলের স্ক্রিনে, এক হাতে সাইকেল কিন্তু অন্য হাতে মোবাইলে কথা বলা, ফুটওভার ব্রিজ থাকা স্বত্বেও ব্যস্ত সড়কে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার। রাজধানীসহ সারাদেশেই এমন দৃশ্য চোখে পড়ে অহরহ। এতে যেমন ঘটছে দুর্ঘটনা, তেমনি বাড়ছে প্রাণহানীও। কারও ভ্রুক্ষেপ নেই দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্ক পথ চলায়। অন্যদিকে সড়কে বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিংয়ের অশুভ প্রতিযোগিতা, যেখানে সেখানে গাড়ি দাঁড় করানো, চলার পথে চালকদের সিগনাল না মানার প্রবনতাও চোখে পরে। এটিও দুর্ঘটনার কারণ। দুর্ঘটনারোধে তথা নিরাপদ সড়কের জন্য সংশোধন করা হয়েছে সড়ক পরিবহন আইন।
৭৯ বছরের পুরনো আইনের ভিত্তিতে তৈরি মোটরযান অধ্যাদেশ বাতিল করে শুক্রবার থেকে সারা দেশে কার্যকর হতে যাচ্ছে আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮। এই আইনে সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে গুরুদ- নিশ্চিত হবে। নতুন আইনে সব ধারায় আগের চেয়ে সাজা বাড়ানো হয়েছে। ফলে আইনটি কার্যকর হলে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, চালক বা শ্রমিককে সাজা বা ফাঁসি দিলে দুর্ঘটনা বন্ধ হবে এমন অলীক কল্পনা যারা করেন, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। তিনি বলেন, সব দেশে আইন আছে। কেউ কাউকে হত্যা করলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড। এ কঠিন আইন থাকার পরও কি হত্যাকান্ড বন্ধ হয়ে গেছে? তাদের মনে রাখতে হবে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হত্যাকা- নয়। দুর্ঘটনা দুর্ঘটনাই। এই দুর্ঘটনার জন্য চালক এককভাবে দায়ী নয়। বৃহস্পতিবার সকালে সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-ডিআরইউর স্বাধীনতা হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ার জেরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারাদেশে নজিরবিহীন আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে সড়ক পরিবহন আইন পাস করা হয়। ওই বছরের ৮ অক্টোবর আইনের গেজেট জারি করা হলেও নানা কারণে আইনটি এতোদিন ঝুলে ছিল। অবশেষে এক বছর দুই মাস পর আইনটি কার্যকর হতে যাচ্ছে।
নতুন আইনে বেপরোয়া বা অবহেলায় গাড়ি চালানোর কারণে কেউ গুরুতর আহত বা কারো প্রানহানি হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদ- বা অনধিক ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান রাখা হয়েছে। তদন্তে যদি দেখা যায় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে চালক বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে হত্যাকা- ঘটিয়েছে, তাহলে দ-বিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ সাজা হবে ফাঁসি। তবে এটা তদন্ত সাপেক্ষে এবং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্ধারণ করবে। এটি অজামিনযোগ্য শাস্তি। আগের আইনে ছিল ৩ বছরের কারাদ- ও তা জামিনযোগ্য।
নতুন সড়ক আইনে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স ছাড়া কর্তৃপক্ষের দেওয়া যে কোনো লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট দেওয়া থাকবে। দোষ করলে তা কাটা যাবে। লালবাতি অমান্য, ওভারটেক, গতিসীমা অমান্য, বিপরীত দিক থেকে গাড়ি চালানো, ওজনসীমা লংঘন, নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালালে পয়েন্ট কাটা যাবে চালকের। এ বিধান আগে ছিল না।
নতুন আইনে বৈধ চালক ছাড়া নিয়োগ না দেওয়ার বিধান আবারও যুক্ত করে বলা হয়েছে, কারো ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে তাকে চালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে, লিখিতভাবে চুক্তি সম্পাদন ও নিয়োগপত্র ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তিকে গণপরিবহনের চালক নিয়োগ করতে পারবে না। নিয়োগপ্রাপ্ত চালক তাঁর কাগজপত্র গাড়িতে প্রদর্শন করবেন। এ ছাড়া কন্ডাক্টর লাইসেন্স ছাড়া কন্ড্রাক্টর নিয়োগ করা যাবে না বলে বিধান করা হয়েছে।
ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ছয় মাসের কারাদ- বা অনধিক ২৫ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ের বিধান রাখা হয়েছে। আগে এ অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল চার মাসের কারাদ- বা ৫০০ টাকা অর্থদ-।
কর্তৃপক্ষ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা সমিতি ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি, প্রদান ও নবায়ন করলে শাস্তি অনধিক দুই বছর। তবে অন্যূন্য ছয় মাসের জেল বা এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয়দ-ের বিধান রয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া গাড়ি চালালে অনধিক ছয় মাসের জেল বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে।
নতুন আইনে ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদ পেরোনো ফিটনেস সনদ ব্যবহার করে ইকোনমিক লাইফ অতিক্রান্ত বা ফিটনেসের অনুপযোগী, ঝুঁকিপুর্ণ গাড়ি চালালে ছয় মাসের জেল বা অনধিক ২৫ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ- দেওয়া হবে। এ ছাড়া আরো বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আগের তুলনায় শাস্তি বাড়ানো হয়েছে।
পরিবহন মালিক শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়ক পরিবহন আইনের সব ধারায় মালিক শ্রমিকদের আপত্তি নেই। আইনের বিষয়ে শ্রমিকদের দাবি হচ্ছে-সড়ক পরিবহন আইনের সব ধারা জামিনযোগ্য করতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণির বদলে পঞ্চম শ্রেণি করতে হবে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, এই আইনের সব ধারাকে জামিনযোগ্য করতে হবে। যে কোনও মামলা যে কোনো মালিকের বিরুদ্ধে হতেই পারে। তবে জামিন পাওয়া তাদের অধিকার। আদালত মনে করলে জামিন দেবেন। কিন্তু আইনে সেই সুযোগ না থাকলে তা হবে অবিচার। তিনি বলেন, এ সেক্টরে এখনও শিক্ষিত চালক বা হেলপার পাওয়া যায় না বিধায় আমরা চালক হেলপারদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি শিথিল করার সুপারিশ করেছিলাম।
নিরাপদ সড়ক চাই’র (নিসচা) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইনে সাজা বা অনেক বিষয় আমাদের চাওয়া অনুযায়ী হয়নি। তারপরও যা আছে, তা অতীতের চেয়ে অনেক ভালো। এটি যাতে পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন না হয়ে যায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, এই আইনের দাড়ি কমা সংশোধন করা হয়নি। শাস্তি বেশি বলেই এটি বাস্তবায়নে বাধা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, অকারণে পরিবহন শ্রমিকরা কেন জরিমানা দেবে? এ আইন করা হয়েছে চালকদের শায়েস্তা করার জন্য। বিধিমালা না করেই এ আইন কার্যকর করা উচিত হবে না।


বিজ্ঞাপন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *