আধুনিক সিঙ্গাপুর বনাম স্মার্ট বাংলাদেশ !

Uncategorized আইন ও আদালত উপ-সম্পাদকীয়/মতামত জীবন-যাপন রাজনীতি

গোলাম মওলা রনি, সাবেক সংসদ সদস্য।


বিজ্ঞাপন

মন্তব্য প্রতিবেদন :  আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা এবং দেশটির জাতির পিতা লি কুয়ান আমার স্বপ্নের মানুষ। যেসব মানুষের কর্ম আমাকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে এবং যাদের একটু স্পর্শ করার সাধ্য আমাকে তাড়িত করে, তাদের মধ্যে লি কুয়ান প্রধানতম। রাজনীতি, অর্থনীতি, জাতি গঠন, জাতীয়তাবোধ জাগ্রতকরণ, সভ্যতা-ভব্যতা, শিক্ষা-দীক্ষায় দেশ-জাতিকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ অবস্থানে পৌঁছে দেয়ার কৃতিত্ব যদি একজনমে একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়ে থাকে তবে আমার দৃষ্টিতে সেই মানুষটি হলেন লি কুয়ান। তার বিশালত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের দুঃসাহস আমার নেই- হবেও না কোনো দিন। কিন্তু তাকে ভালোবাসার এবং শ্রদ্ধা করার মানবিক অধিকার আমার রয়েছে। আর সেই অধিকার থেকেই লি কুয়ানের লেখা-বক্তব্য, কর্ম যা কিছু পেয়েছি তা গপাগপ গিলেছি।


বিজ্ঞাপন

আমার জীবনে লি কুয়ানের প্রভাব শুরু হয়েছে সেই নব্বই দশকের শুরুতে, যেবার আমি প্রথম সিঙ্গাপুর গিয়েছিলাম। তারপর যতবার গেছি এবং নগররাষ্ট্রের জনক সম্পর্কে জেনেছি; ততই বিধাতার অপূর্ব সেই সৃষ্টিটি সম্পর্কে যারপরনাই বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়েছি। প্রচণ্ড ভালোবাসার কারণে মনে হয়েছে, লি কুয়ান আমার শরীর-মন-মস্তিষ্কের অংশ এবং তার কর্ম ও আত্মীয়পরিজন সবই আমার সম্পদ এবং সেই বোধ থেকেই লি কুয়ান পুত্র লি সিয়েন লুং আমার একান্ত আপনজন, যদিও আমার জীবনে পিতা লি কুয়ান অথবা পুত্র লি সিয়েনের সাথে চাক্ষুস দেখা সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি কোনো দিন, প্রয়োজন হয়নি এবং হবেও না। কারণ ভালোবাসার জন্য ওসব কিছুই লাগে না। ভালোবাসার প্রধান আদর্শের মিল, চিন্তা-চেতনা ও কর্মের প্রতি তীব্র আকর্ষণ এবং সাধ্যমতো অনুসরণ। এসব কারণে আমি সময় পেলেই লি সিয়েন লুর বক্তব্য শুনি, যিনি বর্তমান সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী এবং ২০০৪ সাল থেকে টানা দুই যুগ দেশটি শাসন করে আসছেন।

বাংলাদেশের পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি ও সিঙ্গাপুরের পরিবারতন্ত্রের মধ্যে মিল-অমিলের চিন্তা যখন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় তখন অবাক বিস্ময়ে ভাবি- সে আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ান কেমন সুসন্তান পয়দা করেছেন এবং সেই সন্তানকে কতটা যত্ন করে সুশিক্ষিত, মার্জিত, দক্ষ, মানবিক, সৎ, বিবেকবান, ন্যায়বিচারক, কৌশলী, পরিশ্রমী এবং বিশ্বমানের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে তারপর নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন। অন্যদিকে, পুত্র লি তার জীবনের সবক্ষেত্রে কিভাবে পিতার নীতি-আদর্শ এবং সমকালীন জীবন-জীবিকার প্রয়োজনের সমন্বয় ঘটিয়ে সিঙ্গাপুরকে ক্রমশ সভ্যতার সুউচ্চ শিখরে নিয়ে যাচ্ছেন, তা ভাবলে সুসন্তান যে আল্লাহর কত বড় নিয়ামত সেটি খুব সহজে অনুভব করা যায়।
যে প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনার জন্য উল্লিখিত লম্বা ভ‚মিকা টানলাম তার নেপথ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুর পার্লামেন্টে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রী লি’র একটি ভাষণ, তার মন্ত্রিসভায় দু’জন সিনিয়র মন্ত্রী ২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরের অভিজাত এলাকায় দু’টি বিলাসবহুল বাড়ি ভাড়া নেন যা নিয়ে তুমুল বিতর্ক ওঠে। জনগণ অভিযোগ করে, মন্ত্রীদ্বয় রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে এত বিলাসবহুল বাড়ি কেন ভাড়া নিলেন? কেউ কেউ অভিযোগ করলেন, তাদের নিজেদের বাড়ি থাকা সত্তে¡ও কেন ভাড়া বাড়িতে উঠলেন? অভিযোগকারীদের একাংশ অবশ্য দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনলেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে তখন প্রধানমন্ত্রী লি তার দুই মন্ত্রীর বাড়ি ভাড়ার বিষয়টি তদন্তের জন্য সিঙ্গাপুর দুর্নীতি দমন কমিশনকে দায়িত্ব দেন।

সিঙ্গাপুর দুর্নীতি দমন কমিশন আমাদের দেশের দুদকের মতো নয়। সিঙ্গাপুরের সব নাগরিক সংস্থাটির সততা-দক্ষতা এবং ন্যায়পরায়ণতার ওপর শতভাগ বিশ্বাসী। অধিকন্তু দুনিয়ার সব সভ্য দেশের দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য যে সংস্থাটিকে রোলমডেল হিসেবে গণ্য করে সেটিই সিঙ্গাপুর দুর্নীতি দমন কমিশন বা সংস্থা। প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অনুরোধে সংস্থাটি ব্যাপক অনুসন্ধান করে অভিযুক্ত দুই মন্ত্রীকে নির্দোষ ঘোষণা করে এবং সেই তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী লি এবং তার দুই সিনিয়র মন্ত্রী সংসদে আত্মপক্ষ সমর্থন করে যে বক্তব্য দেন তা তখন নেট দুনিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল। তাদের সেই বক্তব্যের চৌম্বক অংশ নিয়ে আলোচনার পর স্মার্ট বাংলাদেশের দুর্নীতির হালহকিকত নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করে আজকের নিবন্ধের ইতি টানব।

প্রধানমন্ত্রী লি তার বক্তব্যে বলেন- আমি শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম, আমার মন্ত্রীরা কোনো অনিয়ম করেননি। সিঙ্গাপুরের মন্ত্রীরা বিশ্বের সর্বোচ্চ বেতনধারী এবং তাদেরকে যে বেতন দেয়া হয়, তাতে আলাদা কোনো খাত নেই। ফলে মন্ত্রীরা তাদের পুরো বেতন ইচ্ছেমতো-স্বাধীন মতো ব্যয় করতে পারেন। বাড়িভাড়া, গাড়িভাড়া ইত্যাদি কোনো আলাদা খাত নেই। কাজেই যারা সন্দেহ করেছিলেন যে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মন্ত্রীদের বাড়ি ভাড়ার দায় মেটানো হয় অথবা মন্ত্রীরা তাদের আর্থিক সামর্থ্যরে চেয়ে বেশি ভাড়ায় বাড়িতে থেকেছেন, অথবা ভাড়া দেয়া-নেয়ার মধ্যে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি থাকতে পারে তাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য- আমি বিষয়টি তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন সংস্থাকে দায়িত্ব দেই।

তদন্তকে নির্বিঘ্ন করার স্বার্থে আমি কিংবা আমার মন্ত্রীরা এ যাবতকালে একটি শব্দও উচ্চারণ করিনি। তদন্ত কর্মকর্তারা মন্ত্রীদের কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাননি এবং এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমাদের মনে হয়েছে, পুরো বিষয়টি জাতিকে জানানো উচিত। এরপর তিনি তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের দায়িত্ব-কর্তব্য, বেতন-ভাতা এবং তার নিজের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে যে বক্তব্য দেন তা শোনার পর যেকোনো সভ্য মানুষের হৃদয় শীতল হতে বাধ্য। অন্য দিকে, অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়া দুই মন্ত্রী পার্লামেন্টে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। কেন তারা এত বড় বাড়ি ভাড়া নিলেন, কোথা থেকে টাকা এলো, কিভাবে ভাড়া নিলেন ইত্যাদি বিষয়াদি সবিস্তারে জাতির সামনে তুলে ধরেন। কথা বলতে গিয়ে তারা কখনো আবেগতাড়িত হয়েছেন, কখনো বা তাদের গলা শুকিয়ে গেছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে গ্লাসের পর গ্লাস পানি পান করেছেন।

আপনি যদি উল্লিখিত ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্কে চিন্তা করেন তাহলে বুঝতে পারবেন, সিঙ্গাপুরে গণতন্ত্র কতটা বিকশিত হয়েছে আর গণতন্ত্রের শত ফুলের সুবাসে সেখানে রাজনীতিবিদরা সিংহ হয়ে যান না; বরং জনগণের ভয়ে তারা অশ্রুসিক্ত হন এবং সঠিক নিয়মে কাজ করার পরও গণধিকৃত হওয়ার ভয়ে গলা শুকিয়ে যায়।

সিঙ্গাপুরের সাথে যদি বাংলাদেশের তুলনা করেন তবে প্রথমেই লক্ষ করবেন, সেখানকার রাষ্ট্রনায়করা কখনো নিজেদের আধুনিক-ডিজিটাল বা স্মার্ট দেশের রূপকার বলেননি। অথচ সারা দুনিয়ার আনাচে-কানাচে আমার মতো লাখ লাখ লোক রয়েছেন যারা সিঙ্গাপুরের গুণকীর্তন করছেন হৃদয়ের একান্ত অনুভব থেকে। অন্য দিকে, ডিজিটাল বাংলাদেশ-স্মার্ট বাংলাদেশ সম্পর্কে দেশের বাইরে কী সব কথাবার্তা হয় তা বলতে পারব না। তবে রঙ্গপ্রিয় বঙ্গবাসী হরহামেশা পথেঘাটে-চায়ের আড্ডায় যেসব বুলি আওড়ায় তার বেশির ভাগই খিস্তিখেউড় এবং মুদ্রণ অযোগ্য। অন্যদিকে, স্মার্ট বাংলাদেশের দুর্নীতির হালহকিকত কেমন তা যদি বিশ্লেষণ করতে হয় তবে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে অবশ্যই স্মরণ করতে হবে। তিনি ২০১০ সালের দিকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের দুর্নীতিকে এখন আর পুকুরচুরি বলা যাবে না- এখনকার দুর্নীতিকে সাগর-মহাসাগর চুরি বলতে হবে।

আবুল মাল আব্দুল মুহিত আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। তিনি যদি থাকতেন তবে হালফ্যাশনের দুর্নীতির ফিরিস্তি দিতে গিয়ে বলতেন, এখনকার দুর্নীতিকে আর সাগর-মহাসাগর চুরি বলা যাবে না- বলতে হবে মহাকাশ চুরি। অর্থাৎ সপ্তম আকাশের যা কিছু রয়েছে তা হোক সেটি নীহারিকা-উল্কাপিণ্ড-গ্রহ-উপগ্রহ কিংবা নক্ষত্রপুঞ্জ, অথবা ভয়ঙ্কর ব্লাক হোল! সবাই আজ মর্ত্যলোকের দুর্নীতির মহাকাশ চোরদের ভয়ে কম্পমান এবং নিজের মানইজ্জত ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মহাকাশের সৃষ্টিকুল কি সপ্তম আকাশ ভেদ করে আরশে আজিমে আশ্রয়ের চেষ্টা করছে কিনা তা হয়তো মুহিত সাহেব জানেন না। তবে চোরেরা নিশ্চয়ই জানে।

(লেখক : গোলাম মওলা রনি, সাবেক সংসদ সদস্য,  টাইমলাইন থেকে নেওয়া )


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *