কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের গুটি কয়েক কর্মকর্তার কারণে গোটা বোর্ড এখন দুর্নীতির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে

Uncategorized আইন ও আদালত

নিজস্ব প্রতিনিধি ঃ কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের গুটি কয়েক কর্মকর্তার কারণে গোটা বোর্ড এখন দুর্নীতির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বোর্ডের সচিব নূর মোহাম্মদ এক যুগের বেশি সময় ধরে বোর্ডে কর্মরত। তিনি ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি উপ-সচিব (একাডেমিক) পদে যোগদান করেন। ২০১৯ সালের ২৪ মার্চ তাকে সচিব পদে পদায়ন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি। সুশীল সমাজের মন্তব্য একই জায়গায় কলেজশিক্ষকরা খুঁটি গেড়েছেন। এ যেন দুর্নীতির এক ভাগাড়!কুমিল্লা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর জামাল নাসের ২০১৫ সালে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরিচালক হিসাব নিরীক্ষা পদে যোগ দেন। পরে কলেজ পরিদর্শক পদে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের মার্চে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে তার পদায়ন হয়। আবার ২০২২ ঘুরে ফিরে তিনি কুমিল্লা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন। মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালীন নানা বির্তর্কে জড়িয়ে সমালোচনার ঝড় তুলেন প্রফেসর জামাল নাসের। নিজের নামে মঞ্চ, সরকারি অর্থ লুট, ভাষা সৈনিকের সন্তান হলেও স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিকে অবমূল্যায়ন, জাতির জনক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থাকা, সাবেক অধ্যক্ষের মাইলফলক সড়িয়ে ফেলা, পিডিবি’র প্রজেক্ট নিজের লোকদের দিয়ে কমিশন খাওয়া, কলেজের পুকুর নিজস্ব লোকদেরকে লিজ দেওয়া, নিজের ছেলের প্রতিষ্ঠান থেকে কলেজ সামগ্রী ক্রয় করা, জামাত-বিএনপির লোকদের সাথে সখ্যতা করাসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত প্রফেসর জামাল নাসের। চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করতে না করতেই নানা সমালোচনার জন্ম দেন প্রফেসর জামাল নাসের। এ নিয়ে সর্বত্রে নানা সমালোচনা চলছে।অন্যদিকে নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে এক যুগের ও বেশি সময় বোর্ডের সচিব পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন প্রফেসর নূর মোহাম্মদ।কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের যত দুর্নীতি আর অনিয়ম সবকিছুই ডালপালা গজিয়েছে কুমিল্লা বোর্ডের সচিব নূর মোহাম্মদ ও উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামকে ঘিরে। এ দুই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে একটি জায়গায় কাজ করায় তাদের নিজস্ব বলয় তৈরি হয়েছে। সূত্র আরো জানায়, তাদের যোগসাজশে কুমিল্লা বোর্ডে অর্ধ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক জায়গায় অনুমোদন নিয়ে অন্য জায়গায় ক্লাশ চালায়। পরীক্ষা দেয় আরেক জায়গায়। যা একটি বিস্ময়কর ঘটনা বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মূল পদ সরকারি কলেজ। কিন্তু বহু শিক্ষক তদবির করে শিক্ষাবোর্ডে প্রেষণে গিয়ে আর ফিরতে চান না নিজ পেশায়। বছরের পর বছর বোর্ডের পদ আঁকড়ে থেকে জড়িয়ে পড়ছেন দুর্নীতিতে। ২০১৭ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তিন বছরের বেশি এবং চাকরি জীবনে দুই বারের বেশি কোনো শিক্ষক প্রশাসনিক পদে থাকতে পারবেন না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি গণমাধ্যমে বলেন, অস্বাভাবিক সময় ধরে বোর্ডে যারা কর্মরত আছেন তাদের তথ্য পেলে বদলি করা হবে। কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ আমাদের কাছে আসলে ব্যবস্থা নেই। অভিযোগ না পেলে তো কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি না।অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লা বোর্ডের সচিব নূর মোহাম্মদ, বর্তমান বোড চেয়ারম্যান জামাল নাসের, উপ-বিদ্যালয় পরিদর্শক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ২০১০ সালের ৯ নভেম্বর থেকে কর্মরত। উপ-কলেজ পরিদর্শক বিজন কুমার চক্রবর্তী ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর থেকে একই পদে আছেন। উপ-বিদ্যালয় পরিদর্শক মোহাম্মদ জাহিদুল হক ২০১৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে বোর্ডে আছেন। উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (উচ্চমাধ্যমিক) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল থেকে বোর্ডে কর্মরত। উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম ২০১৬ সালের ৬ মার্চ থেকে কুমিল্লা বোর্ডে কর্মরত। জানা গেছে, সারা দেশের সরকারি, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত নিয়ন্ত্রণ করে শিক্ষা বোর্ডগুলো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি, পাঠদানের অনুমতি, একাডেমিক স্বীকৃতি, অতিরিক্ত শ্রেণি শাখা, বিভাগ ও বিষয় খোলা, আসন বৃদ্ধি বোর্ডের দায়িত্ব। বোর্ডের কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ায় সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বোর্ডের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমোদন দেন। তবে বোর্ডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়। এ কাজে বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মোটা অংঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিও ভুক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হয়। এ কাজে বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বোর্ডের কর্মকর্তারা টাকা ছাড়া প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি নবায়ন করেন না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি অনুমোদনেও বোর্ডের কর্মকর্তাদের টাকা দিতে হয়। শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, ভর্তি বাতিল, নিবন্ধন, শ্রেণি ছাড়পত্র, দ্বি-নকল রেজিষ্ট্রেশন কার্ড সংগ্রহের কাজ টাকা ছাড়া হয় না। নাম ও বয়স সংশোধনের ক্ষেত্রেও টাকা গুনতে হয় শিক্ষার্থীদের। বছরের পর বছর বোর্ডে কর্মরত থাকার সুযোগে প্রত্যেকে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি (বাশিস) নজরুল ইসলাম রনি বলেন, বোর্ডে প্রেষণে একবার আসলে কেউ আর যেতে চান না। এখানে মধু আছে। শিক্ষার পুরো কাজ বোর্ডে হয়। টাকা না দিলে কোনো ফাইল নড়ে না। অভিজ্ঞতা না থাকলেও টাকার বিনিময়ে প্রধান পরীক্ষক বানানো হয়। ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও বোর্ড টাকা নিয়ে নির্বাচন দেয় না। তিনি আরো বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান, স্বীকৃতির অনুমোদন, শাখা খোলা, আসনবৃদ্ধির কাজ টাকা না দিলে বোর্ড করে না। শিক্ষকরা বোর্ডে গেলে তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী তিন বছরের বেশি সময় যারা কর্মরত আছেন তাদের সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সাবেক এক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, বোর্ডের চাকরি সোনার হরিন। পৃথিবীর কোথাও এতো বোনাস নাই। বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সারা বছর যা বেতন পায় তার চেয়ে বেশি বোনাস পান।


Leave a Reply

Your email address will not be published.