নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ সাম্প্রতিক সময়ে র্যাব গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, একটি চক্র অবৈধ পথে পাশর্^বর্তী দেশ হতে আগ্নেয়াস্ত্র চোরাচালানের মাধ্যমে রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করছে।
চক্রটি চোরাচালানকৃত অবৈধ অস্ত্র অভিনব কৌশলে ভুয়া ও জাল লাইসেন্স তৈরির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট বিক্রি এবং তাদের বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা সংক্রান্ত চাকরি দেওয়ার নাম করে আগ্রহীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিত। এই সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব এই চক্রের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে।
এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-২ এর একটি যৌথ আভিযানিক দল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।
উক্ত অভিযান পরিচালনা কালে চক্রের মূলহোতারা যথাক্রমে, মোঃ পলাশ শেখ (৩৮), পিতা-মোঃ নবীর শেখ, থানাঃ কালিয়া, জেলাঃ নড়াইল, মোঃ মনোয়ার হোসেন (৩২), পিতা-মোঃ শেরেকুল ইসলাম, থানাঃ সদর, জেলাঃ নওগাঁ, রশিদুল ইসলাম (৪০), পিতা-আব্দুর রহমান, থানাঃ সদর, জেলাঃ দিনাজপুর, নাজীম মোল্লা (৩৫), পিতা-মৃত আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা, থানাঃ কালিয়া, জেলাঃ নড়াইল, মারুফ হোসেন (২৪), পিতা-মোঃ জাহাঙ্গির আলম, থানাঃ উল্লাপাড়া, জেলাঃ সিরাজগঞ্জ এবং মোঃ নাইমুল ইসলাম (২২), পিতা-মোঃ মোস্তফা, থানাঃ রূপগঞ্জ, জেলাঃ নারায়ণগঞ্জদের’কে গ্রেফতার করা হয়।
তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ০১টি বিদেশী পিস্তল, ০২টি ওয়ান শুটার গান, ০৭টি একনালা বন্দুক, ০২টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ০৮ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ওয়ান শুটারের গুলি ০২ রাউন্ড, একনলা বন্দুকের গুলি ৬৭ রাউন্ড, ০.২২ বোর রাইফেলের গুলি ৪০ রাউন্ড, ১১টি জাল লাইসেন্স, ১৯টি বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার নামীয় সিল ও অন্যান্য সামগ্রী।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচা এবং জাল লাইসেন্স তৈরী করে আসছিল। গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, চক্রটি অবৈধ পথে পাশর্^বর্তী দেশ হতে আগ্নেয়াস্ত্র চোরাচালান করত।
পরবর্তীতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট অভিনব কৌশলে ভুয়া ও জাল লাইসেন্স তৈরির মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র বিক্রয়ের জন্য বেসরকারী বিভিন্ন স্বনামধন্য নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা সংক্রান্ত চাকুরী প্রদানে আকৃষ্ট করে আগ্রহীদের নিকট হতে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিত। চক্রটির মূলহোতা গ্রেফতাকৃত পলাশ। এই চক্রের সদস্য সংখ্যা ৪-৫ জন।
এই চক্রটির মূল কাজ ছিল পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ এবং ভুয়া লাইসেন্স তৈরী করে বিভিন্ন বেসরকারী সিকিউরিটি কোম্পানীতে চাকুরী দেওয়ার প্রলোভনের মাধ্যমে বিভিন্ন বিপুল পরিমান অর্থের বিনিময়ে অবৈধ অস্ত্র বিক্রয় করা।
চক্রটি পার্শ্ববর্তী দেশ হতে রিভলবার, পিস্তল ও এক নলা বন্দুকসহ বিভিন্ন ধরণের আগ্নেয়াস্ত্র অবৈধ পথে দেশে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে আগ্রহী চাকুরী প্রার্থীদের কাছে জাল লাইসেন্সসহ অবৈধ অস্ত্র বিক্রি করে এবং চাকুরি দিয়ে থাকে। এই চাকুরী প্রদানের জন্য জন প্রতি ২-৩ লাখ টাকা পযর্ন্ত নিয়ে থাকে।
অবৈধ অস্ত্র ও ভুয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিকিরিউটি গার্ড হিসাবে চাকুরী করত। এছাড়াও চক্রটি বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে চড়া দামে জাল লাইসেন্স তৈরি করে অবৈধ অস্ত্র বিক্রি করত বলে জানা যায়।
গ্রেফতারকৃত মোঃ পলাশ এই চক্রের মূলহোতা। সে ২০০৪ সালে স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে। জীবিকার তাগিদে ২০১৩ সালে চাকুরীর জন্য ঢাকায় আসে এবং একটি স্বনামধন্য সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ডের চাকুরী শুরু করে।
সিকিউরিটি গার্ডের চাকুরীরত অবস্থায় ২০১৫ সালে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ভুয়া লাইসেন্সকৃত একটি অবৈধ বন্দুক ক্রয় করে একটি বেসরকারী ব্যাংকে অধিক বেতনে সিকিউরিটি গার্ডের চাকুরী শুরু করে।
পরবর্তীতে সে নিজেই অবৈধ পথে অস্ত্র চোরাচালান ও বিক্রয় শুরু করে এবং ৪-৫ জনের একটি দল তৈরি করে। তার নেতৃত্বে চক্রটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে অস্ত্র সংগ্রহ এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তার নামীয় সিল তৈরী করে জাল লাইসেন্স তৈরির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট অবৈধ অস্ত্র বিক্রয় করতে থাকে।
দীর্ঘদিন যাবত একটি স্বনামধন্য বেসরকারি সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করার সুবাধে ঐ প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব অবস্থান তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন চাকুরী প্রার্থীদের অধিক বেতনের চাকুরীর প্রলোভন দেখাত এবং আগ্রহী চাকুরী প্রার্থীদের নিকট অবৈধ পথে আনা ভুয়া লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ২-৩ লক্ষ টাকার বিনিময়ে বিক্রয় করত।
এযাবত ২০-২৫ জনের নিকট অর্থের বিনিময়ে ভুয়া লাইসেন্সকৃত অস্ত্র বিক্রি পূর্বক বিভিন্ন বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী প্রদান করেছে বলে জানা যায়। সে ৫/৬ বছর যাবত পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালানের মাধ্যমে এনে সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরত ব্যক্তিদেরকে অবৈধ অস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি করত বলে জানা যায়।
গ্রেফতারকৃত মোঃ মনোয়ার স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণী পযর্ন্ত পড়াশোনা করে। ২০১৪ সালে চাকরীর জন্য ঢাকায় আসে এবং সিকিউরিটি গার্ডের চাকুরী শুরু করে।
চাকরির সুবাদে পলাশের সাথে তার সু-সর্ম্পক গড়ে উঠে এবং পলাশের সহযোগীতায় দুই লাখ টাকার বিনিময়ে সে একটি ভুয়া লাইসেন্সকৃত অবৈধ একনলা বন্দুক সংগ্রহ করে একটি বেসরকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অধিক বেতনে চাকুরী শুরু করে। পরবর্তীতে পলাশ তাকে অধিক অর্থের লোভ দেখিয়ে অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার জগতে প্রবেশ করায়।
