পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে, উড়বেই !

Uncategorized উপ-সম্পাদকীয়/মতামত ঢাকা বরিশাল রাজধানী রাজনীতি

গোলাম মওলা রনি (সাবেক সংসদ সদস্য)।


বিজ্ঞাপন

গোলাম মওলা রনি :  এমন একটি সময় ছিল যখন আমি কবি হওয়ার জন্য রীতিমতো পাগল হয়ে পড়েছিলাম। তখন আমার বয়স কত ছিল তা জানি না- তবে সম্ভবত তৃতীয় অথবা চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় আমার মধ্যে কবি হওয়ার বাসনা প্রবলতর হয়। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে বাংলা সাহিত্যের নামকরা কবিদের ছড়াগুলো আমাকে স্বপ্নের জগতে নিয়ে যেত। এর বাইরে কাজী নজরুল-রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দীন, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদসহ নামকরা কবিদের জনপ্রিয় শিশুতোষ কবিতা সেই ছোট বয়সেই আমাদের মধ্যে নিদারুণ এক ভাবাবেগ তৈরি করে। ফলে কবি হওয়ার জন্য আমার অদম্য আকাঙ্ক্ষা কতটা পাগলামোর পর্যায়ে পৌঁছেছিল তা স্মরণ করলে আজো নিজের অজান্তে মনের মধ্যে একধরনের রসের সৃষ্টি হয়।


বিজ্ঞাপন

কবি হওয়ার জন্য আমার বালখিল্য নিয়ে দু-চারটি মজাদার ঘটনা বলার আগে আজকের শিরোনামের বিষয়বস্তু নিয়ে সংক্ষেপে কিছু বলে নিই। সেই ১৯৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের কাব্যপ্রতিভার যে সকাল শুরু হয় তা বর্তমান জমানায় এসে রীতিমতো বন্ধ্যত্বে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশ-জাতি-কাল নিয়ে কল্পনা করার মতো লোকজনের মধ্যে না আছে নান্দনিকতা, না সৃষ্টিশীলতার কোনো রেশ। ফলে আমরা সবাই এক স্থবির সময়ের কবলে পড়ে কিভাবে ক্রমাগত জংলি জীবনে ফিরে যাচ্ছি তা আমাদের রাজনীতি-অর্থনীতি-শিক্ষাব্যবস্থা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির দিকে তাকালেই অনুমান করা যায়। বিষয়বস্তু যেন গুরুগম্ভীর হয়ে না পড়ে এ জন্য আমার শৈশব থেকে একটু ঘুরে আসা যাক।

কবি হওয়ার পথে আমার সবচেয়ে বড় বাধা ছিল চোখের সামনে কোনো কবি না থাকা। আমাদের দুই চার দশ গ্রামে কোনো কবি ছিলেন না। ফলে কবির সান্নিধ্য লাভ করে কাব্যপ্রতিভার চর্চা ছিল অসম্ভব। এ অবস্থায় আমার একমাত্র অবলম্বন ছিল প্রতিষ্ঠিত কবিদের কবিতার অনুকরণে কিছু রচনা করা। এই কাজ শুরু করার জন্য আমি অনেক কিছু করলাম। প্রথমে ভাবলাম। অনেক চিন্তাভাবনার পরও কবিতার বিষয়বস্তু মাথায় এলো না। নীরবে ভাবনার জন্য আমি পাটক্ষেতের অভ্যন্তরে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি এবং একসময় শেয়াল বা সাপের ভয়ে ক্ষান্ত দিয়ে তাড়াতাড়ি লোকালয়ে ফিরেছি। কাব্যপ্রতিভা অনুসন্ধানের জন্য তালগাছ, গাবগাছ, বটগাছসহ আম-জাম-কাঁঠালগাছে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছি। কিন্তু দু’কলম কবিতা তো দূরের কথা, কবিতার শিরোনাম নিয়েও কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি।

উল্লিখিত সময়ে আমার মনে একবার ঘুঘু নিয়ে কবিতা লিখার শখ জেগেছিল। ফলে ঘুঘুর বাসা ও বাচ্চাকাচ্চার খোঁজ নিতে গিয়ে আমি কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতা লাভ করলাম। একদিন বাড়ির কাছাকাছি কোনো এক বনবাদাড় ঘুরে বাসা খোঁজার জন্য আমার ছুটোছুটি- গ্রামের এক মুরব্বির নজরে এলো। তিনি মনে করলেন আমি ঘুঘু শিকারের জন্য চেষ্টা করছি। কাজেই তিনি আমাকে ঘুঘুবিষয়ক একটি অদ্ভুত পরামর্শ দিলেন যা শোনার পর আমার বালকবেলার ঘুম হারাম হয়ে গেল এবং মাথা থেকে কবিতা রচনার ভূত দূর হয়ে গেল। তিনি বললেন, বনবাদাড়ে ঘুঘুর বাসা না খুঁজে দুর্গম ফসলি মাঠে যাও। যেখানে দেখবে তিনটি আইল অর্থাৎ তিনটি ক্ষেতের সীমা একত্র হয়েছে- সেখানে যদি কোনো বিন্না ছোবার ঝোপঝাড় দেখো এবং সেখানে যদি কোনো ঘুঘুর বাসা দেখতে পাও তবে নিশ্চিত যে, সেই বিন্না ছোবার নিচে সোনার মোহরভর্তি কলস রয়েছে।

আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন শিশু-কিশোরদের কাছে ১০ পয়সার যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। সিকি বা আধুলি তো রীতিমতো বড়লোকি ব্যাপার। আর এক টাকার নোট ছিল স্বপ্নের বিষয়। কাজেই এমন একটি সময়ে অতি সহজে এক কলস ভর্তি সোনার টাকার কথা শোনামাত্রই মন-মস্তিষ্কের সব লোভ-লালসা, ভোগ-বিলাস, কামনা-বাসনা চিন্তাচেতনা হুড়হুড় করে বের হয়ে এলো এবং তিন আইলের মিলনকেন্দ্রে ঘুঘুর বাসা সংবলিত বিন্না ছোবার ঝোপের দিকে আমাকে তাড়িত করল। আমি নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় কত দিন, কত মাস, কত বছর ধরে যে সোনার মোহর ভর্তি কলসি খুঁজে বেড়াতে গিয়ে কবি হওয়ার বাসনা বিসর্জন দিয়েছি তা আজ আর মনে করতে পারছি না। তবে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় আব্বা যখন আমাদের গ্রাম থেকে শহরে নিয়ে এলেন ঠিক তখন থেকে কবি ও মোহরের মোহ বিদ্যার্জনের তাপ-চাপের কাছে পরাজিত হলো।

একজন ভালো বিদ্যার্থীর সব গুণাবলি বলতে গেলে জোর করেই আমার মধ্যে ঢুকানো হলো এবং ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক অধ্যয়নকাল পর্যন্ত তা অব্যাহত রইল। ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের যে জাতীয় ফলাফল হলো সেখানে আমার কৃতিত্ব দেখে আমি আজো অবাক হয়ে ভাবি, কতটা নির্বোধ হলে তালগাছে উঠে কবিতার কথা চিন্তা করা যায় এবং বিন্না ছোবার নিচে সোনার মোহর ভর্তি কলসি খোঁজার জন্য চৈত্র মাসের দুপুর কিংবা কালবৈশাখীর ঝড় অথবা শ্রাবণের বিরামহীন বৃষ্টি উপেক্ষা করে নির্জন ফসলি মাঠে নিরন্তর ছুটে চলা যায়।

উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সারা দেশ উত্তাল এবং সেই উত্তাল আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র মধুর ক্যান্টিন, অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ অথবা টিএসসিতে প্রতিদিনই গণতন্ত্রের মেলা বসত। আর সেই মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল কবি ও কবিতা। বক্তারা কথায় কথায় কবিতার জ্বালাময়ী ছন্দগুলো আবৃত্তি করে দর্শকদের উত্তেজিত করে তুলত। বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় প্রায়ই কবিতা পাঠের আসর বসত। হাজার হাজার দর্শক ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কবিতা শুনতেন। পেশাদার আবৃত্তিকারদের কণ্ঠে কবিতা যেন আগুনের ফুলকি হয়ে চার পাশের অন্ধকারময় সিন্ধুক খুলে সেখানে আলোকময় মুক্তির স্বাদ এবং গণতন্ত্র-স্বাধীনতা ও সার্বভৌম অভিলাষ প্রবিষ্ট করিয়ে দিত।

উল্লিখিত অবস্থায় আমার জীবন-যৌবনের এক মোহময় সন্ধিক্ষণে পুনরায় কবিতার প্রেমে পড়লাম। এবার আমি শৈশবের মতো সোনার কলসের লোভে বিভ্রান্ত হলাম না। কবিতার প্রেমে কবিদের খোঁজে বের হয়ে বটবৃক্ষসম মানুষদের কাছাকাছি গেলাম। বহুদিন চেষ্টা করার পর বুঝলাম কবিদের উচ্চতা যেকোনো বৃক্ষ অথবা পাহাড়-পর্বতের চেয়েও বেশি এবং কবির ভাষায় লালিত্য অনেক ক্ষেত্রে কবি নিজেও বোঝেন না। ফলে জীবনের সেই পর্যায়ে এসে আমার কাছে অনুভূত হলো যে- আমার পক্ষে কবি হওয়া সম্ভব নয়। এমনকি সব কবির সব কাব্যের সুধারস পান করার যোগ্যতাও আমার নেই। আমি বড়জোর একজন দর্শক-শ্রোতা হয়ে কবিতার মঞ্চের দর্শক সারির শূন্য আসনগুলোর একটি দখল করতে পারি মাত্র।

২০২২ সালের আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে নিবন্ধ লিখতে গিয়ে হঠাৎ কবিতার কথা মনে এলো মূলত দু’টি কারণে। প্রথমত, ইদানীংকালে কবি-গায়ক-নায়ক হওয়ার জন্য অনেকের বাড়াবাড়ি ও দ্বিতীয়ত, এরশাদ জমানার বিখ্যাত এক কবির বিখ্যাত এক কবিতার কয়েকটি লাইন। মোহাম্মদ রফিক তার খোলা কবিতায় লিখেছিলেন- ‘সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে, উড়বেই; বন থেকে দাঁতাল শুয়োর, রাজাসনে বসবেই’।

মোহাম্মদ রফিকের কবিতা ছাড়াও নির্মলেন্দু গুণ ও কবি মহাদেব সাহার কবিতার কয়েকটি লাইন কানে বাজছে! ‘দূর হ দুঃশাসন’ কবিতায় নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন-
‘তোর হাতে রক্ত, পায়ে কুষ্ঠ,
কণ্ঠে নালী ঘা-
আল্লার দোহাই লাগে, তুই নেমে যা, নেমে যা’।
মহাদেব সাহা তার বাংলাদেশ চায় না তোমাকে’ কবিতায় লিখেছেন-
‘তোমাকে চায় না এই মানচিত্র,
জাতীয় পতাকা
তুমি চলে যাও, দেশ ছেড়ে চলে যাও!

কবি ও কবিতার অতীত স্মৃতি নিয়ে আজো আমি ঢাকার রাজপথে ছুটে চলছি। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পার হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আজো আমি ঢুঁ মারি। রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কিংবা পল্টন ময়দান। সর্বত্র তৃষ্ণার্ত চোখ আর ব্যাকুল হৃদয় নিয়ে কী যেন শোনার আকাঙ্ক্ষায় কানকে সজাগ করে রাখি। কিন্তু কোনো কবিতার শব্দ আমাকে চমকিত করে না। এই শহরে বটবৃক্ষের মতো কবিদের পদচারণা আমার নজরে আসে না। ক্লান্ত বিধ্বস্ত আমি যখন পথহারা পথিক অথবা নীড়হারা পাখির মতো ছটফট করতে থাকি ঠিক তখনই সর্বনাশ সামাজিক মাধ্যমের নকল বুদ্ধিমত্তা আমার সামনে অসংখ্য ভিডিও ক্লিপ এনে হাজির করে যার মধ্যে কোনোটির শিরোনাম- ‘দাইমা’ আবার কোনোটির শিরোনাম ‘সাদা সাদা কালা কালা’! এসব দেখে মনে হয় চলমান সময়ে কবিতারা সব বিন্না ছোবার নিচে আশ্রয় নিয়েছে এবং সোনার মোহরে রূপান্তরিত হয়ে কলসবন্দী হয়ে পড়েছে। আর সেই মোহররূপী কবিতার কলসগুলো পাহারা দিচ্ছে ঘুঘুর দল।(লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য)


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *